হিংসার উদযাপনের পোস্টারবয় রণবীর, ‘ধুরন্ধর’-এর সিক্যুয়েল কি প্রথম ছবিকে ছাপিয়ে যেতে পারল?

অত্যন্ত হাইপড, বহু প্রতীক্ষিত আদিত্য ধর পরিচালিত ছবি ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ এসে গিয়েছে। পেড প্রিভিউতে আকাশছোঁয়া দামে টিকিট কেটে হল ভরিয়েছে কলকাতার দর্শক। পকেট ফুটো করে তেমনই এক শোয়ে ছবিটা দেখতে গিয়েছিলাম। ছবি চলাকালীন ‘ফ্লিব্যাগ’ সিরিজের একটা সংলাপ মনে পড়ে গেল। সেটা তুলে দিচ্ছি– ‘নারী তার শরীরে যন্ত্রণা নিয়েই জন্মায়…পুরুষ নয়। যন্ত্রণা অনুভব করতে তাদের নানা কিছু করতে হয়… তাই পুরুষ যুদ্ধ তৈরি করেছে, যাতে তারাও কিছু অনুভব করতে পারে এবং অন্য পুরুষদের স্পর্শ করতে পারে, আর যুদ্ধ না থাকলে তারা তখন রাগবি খেলে..।’ আর ছবির শুরুতেই মিস্টার সান্যাল (মাধবন) বলে দেন, ‘আমরা পুরুষ, আমরা সব কিছুর জন্য লড়াই করি…’।
যাঁরা প্রথম ‘ধুরন্ধর’ দেখেছেন তাঁরা এবং যাঁরা দেখেননি দুই ধরনের দর্শকই উপচে পড়েছিল কলকাতার এই মাল্টিপ্লেক্সে। আর এই মাল্টিপ্লেক্সেই বলিউডের অ্যান্টি ওয়ার ফিল্ম ‘ইক্কিস’ দেখার লোক ছিল না। কারণ ক্যাপিটালিস্ট পৃথিবীতে যুদ্ধ, হিংসা, রক্ত সময়ের দাবি করে তোলা হয়েছে। ছবিতে গল্প যত না এগোয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মন দেওয়া হয়েছে একেকটা ফাইটিং সিকোয়েন্সে।
প্রায় চার ঘণ্টা নাকি তার চেয়েও বেশি সময় ধরে (হিসাব নেই) গোটা ছবিজুড়ে কিছু পুরুষ যত রকমভাবে সম্ভব পরস্পরের সঙ্গে লড়ে গেল, পরস্পরকে যত রকমভাবে সম্ভব তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে গেল। হিংসার সেই উদ্ভাবনী উদযাপন চলল এই চার-সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে। উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রোপাগান্ডা আড়াল করতে হিংসা নাকি প্রোপাগান্ডা দিয়ে বর্তমান বিশ্বের হিংসাপ্রেম আড়াল করতে চাইলেন নির্মাতারা, বোঝা শক্ত। সোজা কথা, এই মুহূর্তে এই দুই-ই লাভজনক, এই দুইয়ে মিললেই লক্ষ্মীলাভ। তাই এই ফর্মুলাই বোধহয় প্যান-ইন্ডিয়া জুড়ে ব্যবসা আনার অন্যতম উপায়। যাঁরা প্রথম ‘ধুরন্ধর’ দেখেছেন তাঁরা এবং যাঁরা দেখেননি দুই ধরনের দর্শকই উপচে পড়েছিল কলকাতার এই মাল্টিপ্লেক্সে। আর এই মাল্টিপ্লেক্সেই বলিউডের অ্যান্টি ওয়ার ফিল্ম ‘ইক্কিস’ দেখার লোক ছিল না। কারণ ক্যাপিটালিস্ট পৃথিবীতে যুদ্ধ, হিংসা, রক্ত সময়ের দাবি করে তোলা হয়েছে। ছবিতে গল্প যত না এগোয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মন দেওয়া হয়েছে একেকটা ফাইটিং সিকোয়েন্সে।
‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ ট্রেলারে ‘হামজা’ রণবীর সিং। ছবি- সংগৃহীত
আগের ‘ধুরন্ধর’-এ ‘রহমান ডাকাত’ (অক্ষয় খান্না) শো-স্টপার হলেও এই ছবিতে রণবীর সিং রাজত্ব করেছেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। কখনও তাঁর চুল ঢেউ খেলানো শ্যাম্পু-স্নাত, কখনও সেই কেশরাশি রক্তভেজা। আর আদুর গায়ে, পেশিবহুল শরীরে সেই রক্তসিক্ত চুলে তিনি ঘায়েল হয়ে দেখা দিলে মনে হবে, আহা যেন সদ্য পুণ্যস্নান করে উঠেছেন। তিনিই এই ছবির শো-স্টপার, বলা ভালো ওয়ার-পর্ন সৈনিকের সেক্স সিম্বল। তিনিই এই ছবির একমাত্র টান। আর তাতেই মাতোয়ারা দর্শক। স্পাই থ্রিলার তো একটা কভার মাত্র, কারণ টানটান স্পাই থ্রিলার করতে গেলে যে চিত্রনাট্য প্রয়োজন সেই সবের ধার ধারেননি পরিচালক। তবে প্রথম ‘ধুরন্ধর’— এ যা চমক বলে মনে হয়, তা এই ছবিতে খানিক একঘেয়ে লাগতে পারে। হিংসার ওভারডোজ হয়ে যাওয়ার পর আরও কতটা হিংসা লাগবে একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে?– এর উত্তর আমার জানা নেই।
দেখতে দেখতে দর্শকের রক্ত গরম হবেই। আর রক্ত গরম হলে বক্স অফিসও গরম। এই ছবিতে বিনোদন মূলক যা কিছু তা গল্পে না থাকলেও আছে কেবল ধুরন্ধর হিংসায় যা এখন অতিমারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং এই বিপজ্জনক ট্রেন্ড সিনেমা-শিল্পের খোলনলচে বদলে দিচ্ছে।
‘ধুরন্ধর ২’-এর একটি দৃশ্যে রণবীর সিং।
আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর’ পৃথিবীতে নারীর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ছবির শুরুর দিকেই দেখি, একজন ধর্ষিত নারী (হামজার বোন), ছবির দেড় ঘণ্টার মাথায় দেখি একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী (হামজার স্ত্রী) যাকে একজন উদ্দেশ্য করে বলে– ‘ভালো বউ হবে’, অর্থাৎ বিয়ে করে, সন্তানধারণ করাই তার কাজ। দেড়ঘণ্টার আরও কিছু পর ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত এক শিশুকন্যাকে দেখানো হয় (মেজর ইকবালের কন্যা)। আর ছবির শেষে দেখানো হয় সেই অসহায় স্ত্রী এবং হামজার মা ও বোন। এই ছবিতে নারীর অবদান এই পর্যন্তই সীমিত। পুরুষদের মধ্যে শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ ছাড়াও আছে ২০১৬ সালের উরি- সার্জিকাল স্ট্রাইক বা নোটবন্দির পক্ষে সওয়াল, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। আছে পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদীর মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া, ‘ভারত মাতা কি জয়’! চেনা চেনা লাগছে? ‘জয় শ্রীরাম’ বলিয়ে নেওয়ার মধ্যেও এমন গা-জোয়ারি দেখা যায়। তবে এই ছবিতে যা কিছু নিবেদন সব ‘ভারত মাতা কে নাম’। বলাও হয়, শত্রুতা পাকিস্তানের সঙ্গে নয়, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে। ফলে দেখতে দেখতে দর্শকের রক্ত গরম হবেই। আর রক্ত গরম হলে বক্স অফিসও গরম। এই ছবিতে বিনোদন মূলক যা কিছু তা গল্পে না থাকলেও আছে কেবল ধুরন্ধর হিংসায় যা এখন অতিমারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং এই বিপজ্জনক ট্রেন্ড সিনেমা-শিল্পের খোলনলচে বদলে দিচ্ছে।

Source: Sangbad Pratidin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *