মেনোপজের পর থেকেই স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে থাকে? অ্যালঝাইমার্স নিয়ে নয়া গবেষণায় উদ্বেগ

মেনোপজের সময় নারীদের শরীরে বড় ধরনের হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দ্রুত কমে। এই হরমোন শুধু প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য নয়, মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তাই ইস্ট্রোজেন কমলে মস্তিষ্কের কোষ, স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তাশক্তির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই পরিবর্তনগুলোই ভবিষ্যতে অ্যালঝাইমার্সের ঝুঁকি বাড়ানোর একটি কারণ হতে পারে।
কেন নারীদের ঝুঁকি বেশি?
বিশ্বজুড়ে অ্যালঝাইমার্স আক্রান্তদের বড় অংশই নারী। আগে ধারণা ছিল, নারীরা তুলনামূলক বেশি দিন বাঁচেন বলেই এই সংখ্যা বেশি। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি আরও জটিল। মেনোপজের সময় হরমোনের পরিবর্তন, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি, মস্তিষ্ককের সুরক্ষায় প্রভাব ফেলে। এর ফলে স্নায়ুকোষ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রোটিন জমার সম্ভাবনা বাড়ে, যা অ্যালঝাইমার্সের সঙ্গে জড়িত।
ছবি: প্রতীকী
মেনোপজ: মস্তিষ্কের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়
এখন অনেক বিশেষজ্ঞ মেনোপজের সময়টাকে মস্তিষ্কের জন্য এক ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন। এই সময়ে মস্তিষ্কে শক্তির ব্যবহার কমে, বিশেষ করে গ্লুকোজের ব্যবহার কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। পাশাপাশি গ্রে ম্যাটারের পরিমাণও কিছুটা কমতে পারে। এসব পরিবর্তন ধীরে ধীরে স্মৃতি ও মনোযোগে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, যা ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়ার দিকে এগোতে পারে।
মাঝবয়সে স্মৃতির সমস্যা কি সতর্কবার্তা?
অনেক নারী মেনোপজের সময় ভুলে যাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া বা ‘ব্রেন ফগ’-এর মতো সমস্যার কথা বলেন। এগুলোকে অনেক সময় স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে ধরা হয়। তবে যদি এই সমস্যাগুলো ঘন ঘন হয় বা দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ কিছু ক্ষেত্রে এগুলো মস্তিষ্কে চলতে থাকা সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে।
ছবি: প্রতীকী
প্রজনন স্বাস্থ্য ও ঝুঁকির যোগসূত্র
কিছু প্রজনন-সংক্রান্ত বিষয়ও অ্যালঝাইমার্সের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যেমন, যদি ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজ হয়, তাহলে ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে। একইভাবে অল্প বয়সে ডিম্বাশয় অপসারণ করলে দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। কিছু হরমোনজনিত সমস্যা, যেমন পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম থাকলেও ঝুঁকির সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হরমোন থেরাপি নিয়ে নতুন ভাবনা
মেনোপজ ও হরমোন থেরাপি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। আগে মনে করা হতো, এটি বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে নতুন গবেষণায় একটি বিষয় উঠে এসেছে- সঠিক সময়ে, অর্থাৎ মেনোপজের কাছাকাছি সময়ে এই থেরাপি শুরু করলে কিছু ক্ষেত্রে উপকার মিলতে পারে। তবে এটি এখনও সবার জন্য নির্দিষ্টভাবে সুপারিশ করা হয় না এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নেওয়াও উচিত নয়।
ছবি: প্রতীকী
জীবনযাপন ও অন্যান্য প্রভাব
শুধু হরমোন নয়, জীবনযাত্রাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ঘুমের সমস্য়া ইত্য়াদি বিষয়গুলো মেনোপজের পর বাড়তে পারে এবং এগুলো অ্যালঝাইমার্সের ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত। তাই এই সময়ে সুস্থ জীবনযাপন খুবই জরুরি। যেমন- নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্য়াভ্য়াস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এই ছোট ছোট অভ্যেসই ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি কমাতে পারে।
আগেভাগে শনাক্তকরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এখন এমন কিছু আধুনিক পরীক্ষা রয়েছে, যেগুলো লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে। ফলে মাঝবয়স থেকেই সতর্ক হয়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তন বা চিকিৎসার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
অ্যালঝাইমার্স শুধু বার্ধক্যের রোগ নয়, এর শুরু অনেক আগেই হতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন সচেতন হলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

Source: Sangbad Pratidin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *