ভোটের স্কিপার: ভুলে গেলেও সেন-সেশনাল!

কে না জানে, তৃণমূল কংগ্রেসে গায়কের ছড়াছড়ি। কবীর সুমন, নচিকেতা, বাবুল সুপ্রিয়, ইন্দ্রনীল সেন থেকে অদিতি মুন্সী কিংবা ইমন চক্রবর্তী। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গান ভালোবাসেন। নিজে গান গান, লেখেনও। স্টারকাস্ট গায়ক-পুরুষদের মধ্যে অন্যতম ইন্দ্রনীল সেন মুখ্যমন্ত্রীর গানে সুর দিয়েছেন, গেয়েওছেন। কিন্তু এই সংস্কৃতি বোধের বাইরেও একেবারে পোড়খাওয়া তৃণমূলী রাজনৈতিকদের মতোই নানা সময় ঢাল-তরোয়াল পাকড়েছেন। তবে অনেক সময়ই গান তাঁর হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালে সিএএ বিরোধী মিছিলে তিনি লোকগীতির মতো করেই গেয়েছিলেন, ‘আমরা সবাই নাগরিক, এনআরসি হবে না…’। ফলে, তিনি স্রেফ গায়ক নয়, রাজনৈতিক গায়কের ভূমিকায়, যার গানের মধ্যে লুকিয়ে থাকবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-বিধেয়। সকলেই জানেন, সেন-দৃষ্টি না থাকলে তৃণমূলের গানের ভাঁড়ার কম পড়বে।
শ্রীরামপুরের হেরিটেজ উৎসবের ঘোষণায় তাঁকে ভারি আদরআত্তিযত্নম করেছিলেন সাসংদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বরণ করার সময় হালকা শ্লেষ ছিল তাঁর ঠোঁটে: ‘আসল লোকের খোদ লোক ইন্দ্রনীল সেন। তাঁকে যত্ন তো করতেই হবে। না-হলে আমার চাকরি থাকবে না। কী গান শুনিয়ে দেবে, তখন আমার চাকরি চলে যাবে!’
দীঘার জগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। বারবার নানা ইস্যুতে আক্রমণ করা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে। এমনকী, জগন্নাথ মন্দির ইস্যুকে ‘হিন্দু উত্থান’ হিসেবে দেগে দেওয়ার চেষ্টাও করেছিল বিজেপির জাঁদরেল রাজনৈতিকরা। ইন্দ্রনীল সেনের কোর্টে এ-কথা যখন পড়ে, তিনি সযত্নে উত্তর দিয়েছিলেন: ‘সব মানুষের কাছে এই প্রসাদ যাবে। হিন্দু, মুসলিম, শিখ সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ এই প্রসাদ পাবেন। এটা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়ায়ের প্রকল্প। ধর্ম আমার ধর্ম তোমার, উৎসব যেমন সবার, এই মহাপ্রসাদও সবার। বাংলার মানুষ জানেন, বিশ্বের মানুষের কাছে প্রমাণ করলেন, ওঁর মতো সেকুলার একজন প্রশাসক ভারতবর্ষ কখনও দেখেনি।’ এই উক্তিতেই পরিষ্কার কেন ‘দিদি’ তাঁকে আগলে রাখেন। তবে, দিদির স্নেহবর্ষণ যেমন তাঁর ওপর রয়েছে, তেমনই রয়েছে বকাঝকাও। দলীয় কর্মসূচিতে ভরা বাজারে মুখ্যমন্ত্রীর থেকে বেজায় ধমকও খেয়েছিলেন ইন্দ্রনীল সেন! মুখ্যমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, ‘শুধু গান করবে, কোনও দায়িত্ব নেবে না?’
গতবারের জগদ্ধাত্রী পুজোয় চন্দননগর জুড়ে বিধায়ক ইন্দ্রনীল সেনের বিস্তর কাট আউটে ভরে গিয়েছিল শহর। না, সে পোস্টার-ব্যানারে কোত্থাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও নাম ছিল না। সে দেখে কেউই কি আর বক্রোক্তি করেনি? নির্ঘাত করেছে!
তবে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা খানিক সমঝে চলেন তাঁকে। কোথাও কী ‘সেন’সেশনাল কাণ্ড ঘটে যাবে, কে-ই বা জানে। শ্রীরামপুরের হেরিটেজ উৎসবের ঘোষণায় তাঁকে ভারি আদরআত্তিযত্নম করেছিলেন সাসংদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বরণ করার সময় হালকা শ্লেষ ছিল তাঁর ঠোঁটে: ‘আসল লোকের খোদ লোক ইন্দ্রনীল সেন। তাঁকে যত্ন তো করতেই হবে। না-হলে আমার চাকরি থাকবে না। কী গান শুনিয়ে দেবে, তখন আমার চাকরি চলে যাবে!’ বুঝুন কাণ্ড! এমনকী, একবার বাগে পেয়ে খোদ ফিরহাদ হাকিমই বলে বসেছিলেন, ‌‌‘ইন্দ্রনীল সেনের রিচ মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত। আমরা ভয়ে থাকি। যদি কানে কিছু লাগিয়ে দেয়!’ তবে ইন্দ্রনীল সেনও কি সভয়ে থাকেন না? মমতা-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ক্যাচাল লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেনি কেউ? গতবারের জগদ্ধাত্রী পুজোয় চন্দননগর জুড়ে বিধায়ক ইন্দ্রনীল সেনের বিস্তর কাট আউটে ভরে গিয়েছিল শহর। না, সে পোস্টার-ব্যানারে কোত্থাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও নাম ছিল না। সে দেখে কেউই কি আর বক্রোক্তি করেনি? নির্ঘাত করেছে! সে ‘খবর’ ইন্দ্রনীল সেনের কানে যেতে তিনি বলেছিলেন, নির্ঘাত বিজেপির লোকেরা এইসব বলছে। রাতারাতি জানিয়েছিলেন, পুজো শুরু হলেই মণ্ডপের বাইরে মুখ্যমন্ত্রীর ছবির কাট আউট বসবে!
কোনও এক মহাপুরুষ বলেছিলেন, পারফেকশনের থেকে ইমপারফেকশেই নাকি সম্পর্ক গড়েপিটে নেওয়া যায় ভালো। তাতে রক্তমাংসের সত্যি থাকে। ইন্দ্রনীল সেন তৃণমূলের সেই রক্তমাংসের ভুলচুকওয়ালা শিল্পী। এমনকী, স্টেজে মুখ্যমন্ত্রীর লেখা গান গাইতে গিয়েও ভুলে মেরে দিয়েছিলেন তিনি। এই ভুলে যাওয়ার ইতিহাস ধরলে, তিনি এক্কেবারে রোহিত শর্মার মতো স্কিপার! যতই ভুলে যান, তাঁকে হেলাফেলা করা চলে না। রাজনৈতিক হুক-পুলে কোনদিন যে বিপক্ষকে ধরাশায়ী করে দেবেন, কে জানে! ব্যাপারখানা, সেন-সেশনাল, তাই না?

Source: Sangbad Pratidin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *