সন্তানের টিকাকরণ নিয়ে বিভ্রান্তি? জাতীয় টিকাকরণ দিবসে জেনে নিন ভ্যাকসিন সূচি

শিশুর সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে টিকাকরণ বা ভ্যাকসিনেশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর জাতীয় টিকাকরণ দিবসে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা মা-বাবাদের মনে করিয়ে দেন, সময়মতো টিকা দেওয়া হলে শিশু মারাত্মক অথচ প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে।
ভারতে শিশুদের জন্য একটি নির্দিষ্ট জাতীয় টিকাকরণ সূচি রয়েছে, যা জন্মের মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়ে ধাপে ধাপে কৈশোর পর্যন্ত চলতে থাকে। তবে বাস্তবে নতুন বাবা-মায়ের কাছে এই সূচি বেশ জটিল মনে হয়।
কখন কোন টিকা দিতে হবে, কতগুলি ডোজ প্রয়োজন বা কোনও টিকা নির্দিষ্ট সময়ে না নিতে পারলে কী করা উচিত- এসব প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। চিকিৎসকদের মতে, এই বিভ্রান্তি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সঠিক তথ্য জানা এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি, কারণ প্রতিটি টিকার সময় নির্ধারণের পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
ছবি: সংগৃহীত
কেন নির্দিষ্ট সময়েই টিকা দেওয়া জরুরি
শিশুর টিকাকরণ সূচি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়। জীবনের যে সময় সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে, সেই সময়েই দেওয়া হয় টিকা।
জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না। তাই এই সময় টিকা দেওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো টিকা নিলে শিশু যক্ষ্মা, পোলিও, হেপাটাইটিস বি, হাম, ডিপথেরিয়া-সহ একাধিক গুরুতর রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পায় এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও অনেকটাই কমে।
জন্মের পর থেকেই শুরু টিকাকরণ
ভারতে নবজাতকের টিকাকরণ সাধারণত জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয়। এই সময় শিশুকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা দেওয়া হয়-

বিসিজি ভ্যাকসিন- যক্ষ্মা থেকে দেয় সুরক্ষা
ওরাল পোলিও ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ
হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের জন্মকালীন ডোজ

এই প্রাথমিক টিকাগুলি শিশুকে এমন কিছু সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে, যা জীবনের প্রথম কয়েক মাসে গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
জীবনের প্রথম ছ’মাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
শিশুর টিকাকরণে প্রথম ছ’মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সময় ৬ সপ্তাহ, ১০ সপ্তাহ এবং ১৪ সপ্তাহ বয়সে কয়েকটি প্রয়োজনীয় টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে-

পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন
ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন
রোটা ভাইরাস ভ্যাকসিন
ইনঅ্যাকটিভেটেড পোলিও ভ্যাকসিন
প্রয়োজনে শিশুদের নিউমোকোক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিনও দেওয়া হয়, যা নিউমোনিয়া ও অন্যান্য গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

এক বছরের কাছাকাছি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকা
শিশুর বয়স যখন ৯ থেকে ১২ মাসের মধ্যে পৌঁছায়, তখন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে-

হাম-রুবেলা ভ্যাকসিন
জাপানি এনসেফালাইটিস ভ্যাকসিন
এই সময় অনেক ক্ষেত্রে ভিটামিন এ-ও দেওয়া হয়, যা শিশুর দৃষ্টিশক্তি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এক বছরের পরেও চলতে থাকে টিকাকরণ
অনেকের ধারণা, শিশুর এক বছর বয়স পার হলেই টিকাকরণ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হয়।

১৬ থেকে ২৪ মাস বয়সে ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস ও টিটেনাসের বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়।
হাম ও পোলিওর সুরক্ষার জন্যও টিকা দেওয়া হয়। ৫ থেকে ৬ বছর বয়সে আবার বুস্টার ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এরপর ১০ ও ১৬ বছর বয়সে টিটেনাস ও ডিপথেরিয়ার টিকা দেওয়া হয়।

ছবি: সংগৃহীত
মা-বাবাদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাকরণ সূচি কোনও বাড়তি চাপ নয়, বরং শিশুকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়ার একটি কার্যকর ব্যবস্থা। তাই কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি-

শিশুর টিকাকরণের রেকর্ড যত্ন করে রাখুন
পরবর্তী টিকার তারিখ মনে রাখতে ফোনে রিমাইন্ডার সেট করুন
নিয়মিত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন

যদি কোনও কারণে নির্দিষ্ট সময়ে একটি টিকা নেওয়া না হয়, তবে নতুন করে পুরো টিকাকরণ শুরু করতে হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব সেই ডোজটি নিয়ে নিলেই সুরক্ষা বজায় রাখা সম্ভব।
জাতীয় টিকাকরণ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময়মতো টিকাকরণই শিশুর সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সহজ এবং কার্যকর উপায়।

Source: Sangbad Pratidin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *